SAHA ANTOR
Published:2020-07-07 16:25:53 BdST
করোনা যুদ্ধে শহীদ জননীর ডাক্তার-সন্তানের মর্মস্পর্শী শোক-গীতিকা
ডেস্ক
__________________
"আই সি ইউতে আমি মায়ের পাশে দাঁড়াই। টুকটাক কথা বলি। নিয়মিত ওষুধ -পথ্য খাচ্ছেন কি না জিজ্ঞেস করি। মা আমাকে মনে করিয়ে দেন, আমি সুপার ম্যান নই। এই ছোঁয়াচে ভয়াল ব্যাধি আমারও হতে পারে। আমি কি করে চলে যাই? মা, আমি যে তোমারই স্তন্যপান করা অর্বাচীন এক সন্তান!"
করোনায় প্রাণপ্রিয় মাকে হারিয়ে শোকস্তব্ধ মেজর ডা. খোশরোজ সামাদ । তিনি অপূর্ব লেখেন। তার শোকার্ত কলম থেকে মায়ের জন্য এই শোক এপিটাফ।
মেজর ডা. খোশরোজ সামাদ
লিখেছেন ,
সন্মিলিত সামরিক হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকরা যেদিন মায়ের সম্ভাব্য পরিণতির কথা জানিয়ে দিলেন সেদিন আমার যুদ্ধ নতুন করে শুরু হল। যে করেই হোক মাকে বাঁচাতে হবে। আই সি ইউতে আমি মায়ের পাশে দাঁড়াই। টুকটাক কথা বলি। নিয়মিত ওষুধ -পথ্য খাচ্ছেন কি না জিজ্ঞেস করি। মা আমাকে মনে করিয়ে দেন, আমি সুপার ম্যান নই। এই ছোঁয়াচে ভয়াল ব্যাধি আমারও হতে পারে। আমি কি করে চলে যাই? মা, আমি যে তোমারই স্তন্যপান করা অর্বাচীন এক সন্তান!
২।'আজ কেমন আছো, মা? ' প্রশ্নের উত্তর কৌশলে এড়িয়ে করোনা আক্রান্ত আমার বাবা আর বোনের আরোগ্য সম্ভাবনার কথা তিনি উৎকন্ঠার সাথে জানতে চান । মায়ের রোগাক্লান্ত মুখচ্ছবিতে করোনা বিদ্ধস্থ এক পরিবারের দুমড়ে মুচড়ে ফেলা মানচিত্র দেখতে পাই।
৩।বিরলপ্রজ ওষুধ দরকার। আমি উন্মত্তের মত মধ্যরাতে সারা ঢাকা চষে ফিরি।প্লাজমা দরকার, আমি উন্মাদ হয়ে যাই। যে করেই হোক প্লাজমা যোগাড় করতেই হবে। নিজে চিকিৎসক হিসেবে সবকিছু বুঝলেও মায়ের চিকিৎসকদেরকে রাতবিরেতে বারবার অধীর হয়ে ফোন করি।
৪।যখন মায়ের লাইফ সাপোর্ট খুলে ফেলা হল তখন আমি মায়ের পাশে। গ্রাফগুলি আর উঠছে না, নামছে না। ফ্ল্যাট -----------------।Our sweetest songs are those that tell of saddest thaught। আমি গ্রাফে মধুরতম সংগীতের স্বরলিপির আঁকিবুঁকি দেখতে পাই।
৫।মাকে মরচুয়ারিতে রাখা হল। মা তো কখনও একা ঘরে থাকেন নি। উনি তো ভয় পাবেন। আচ্ছা ওরা কি মায়ের সাথে আমাকে থাকতে দিবে?
৬।মা কে সি এম এইচ মসজিদে জানাজা পরানো হল।এই তো অল্প কদিন আগেই মায়ের সাথে সারাদিন কাটালাম।এক বিছানায় ঘুমালাম।তাঁর শরীরে কেমন মা মা গন্ধ। তিনি খাটিয়াতে শুয়ে আছেন। আমি দূর থেকেও সেই মা মা সুবাসিত গন্ধ আবার পেলাম।
৭।মাকে বনানীতে সামরিক কবরস্থানে নিয়ে যাওয়া হল। আমার শরীরে তখন হাজার হাতির শক্তি। মাটির জমিনে মা কে নিজহাতে শুইয়ে দিলাম।কবর মাটি দিয়ে ঢেকে দিচ্ছি। কে বলেছে এটা কবর? এখানে মা ঘুমাবেন।ওরা কারা? যারা মায়ের লাশ রাস্তায় ফেলে পালিয়ে যায়?
৮।শিশুকালে মা গল্প বলে আমায় ঘুম পাড়াতেন।আজ আমি মাকে যুদ্ধজয়ের গল্প বলবো। মা তুমি জীবনের অনেক সময়ই জায়নামাজে কাটিয়েছো। জানো মা, মহামারীর মৃত্যু সেতো শহীদের মৃত্যু। আমি সেই শহীদ জননীর নাড়ি ছেঁড়া ধন।আমার কিসের ভয়?
_________________
সম্পাদকীয় নোটস :
শোক বার্তা
--------------
করোনার সাথে দীর্ঘ লড়াই শেষে গত ১ লা জুলাই সন্মিলিত সামরিক হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁকে বনানী সামরিক কবরস্থানে সমাহিত করা হয়।
মরহুমা রাজশাহী মহিলা কলেজের প্রথম নির্বাচিত ভিপি ছিলেন।তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজেও তিনি টেবিল টেনিস খেলায় বিশেষ পারদর্শিতা এবং শওকত ওসমানের ক্রীতদাসের হাসি মঞ্চ নাটকে অভিনয় করে বিশেষ সাফল্য অর্জন করেন।
রত্নগর্ভা মরহুমার জেষ্ঠ্যপুত্র মেজর ডা. খোশরোজ সামাদ ' ডাক্তার প্রতিদিন' এর নিয়মিত লেখক। তাঁর কন্যা ডা. খুরশিদা সামাদ বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস প্রশাসনের এবং কনিষ্ঠপুত্র প্রকৌশলী খুররম সামাদ বহুজাতিক কম্পানিতে পদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত। মৃত্যুকালে তিনি স্বামী পুত্র কন্যা ছাড়াও বহু গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।
প্রয়াত এই মহান নারীর মহাপ্রয়াণে গভীর শোক জানিয়েছেন ডাক্তার প্রতিদিন সম্পাদক ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগ বিদ্যার সহযোগী অধ্যাপক ডা. সুলতানা আলগিন। তিনি বলেন , আমরা স্বজন হারিয়েছি। হারিয়েছি এক মহিয়সী নারীকে। তার সদুপদেশ আমাদের সকলে পাথেয়। আশা করি , তার সুসন্তানেরা সেসব সদুপদেশ লিখিত আকারে সকলের জন্য তুলে ধরবেন।
_____________INFORMATION_________________

